
জীবনের পথে যখন নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তখন ক্ষুধার আগুন শুধু পেটে নয়, মনেও জ্বলে। বিধাতার দয়া বা অবহেলা আলাদা করে না—জীবনের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই মানুষের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। তবু আমি ধন্য, কারণ সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
হঠাৎ মনে পড়ে কাজী নজরুল ইসলামের সেই চরণ—“হে দারিদ্র তুমি মোরে করিয়াছ মহান”। বহুবার ভেবেও আমি নিশ্চিত নই, কবি কি দারিদ্র্যকে কটাক্ষ করেছিলেন, নাকি অভাবের মধ্যে আত্মিক মহত্ত্ব খুঁজেছিলেন। হয়তো কবির দৃষ্টিতে দারিদ্র্য ছিল তাপসের মতো শক্তির উৎস। কিন্তু আমার জীবনে দারিদ্র্য এনেছে শুধু ক্ষুধার জ্বালা, অপমান আর পরজীবী হওয়ার গ্লানি। দারিদ্র্যের তীব্রতায় বড় হওয়া মানুষের চরিত্রে সংযম আসে—এটা সত্য। কিন্তু সেই সংযম কি ক্ষুধার যন্ত্রণা কমায়? নাকি শুধু শেখায় কীভাবে কম খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়?
আমি ক্ষুধাকে ভয় পাই। এটি আমাকে কখনো মহান করেনি—শুধু ক্ষতবিক্ষত করেছে। তবু একটা সত্য বুঝি: প্রকৃত মহত্ত্ব আসে তখনই, যখন মানুষ অন্যের দুর্দশা দেখে নিজেকে দায়িত্ববান মনে করে। ছোটবেলায় খাবারের অভাব সহ্য করে বড় হওয়ায় আমি খাবার নষ্ট দেখলে ঘৃণা বোধ করি। যার এই অভিজ্ঞতা নেই, সে এক থালা ভাতের মূল্য বুঝবে না। আমি নিজে বহু বছর সংসারের ডাল-ভাত জোগাড় করেছি। এই সংবেদন আমি আমার সন্তানদের মধ্যেও তৈরি করার চেষ্টা করি।
আজকাল বিয়েবাড়ি, হোটেলে যে পরিমাণ খাবার অপচয় হয়, তা দিয়ে হাজারো মানুষের ক্ষুধা মেটানো যায়। সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যয় করা অর্থের সামান্য অংশ দরিদ্রদের দিলে অনেকের মাসের খাদ্য নিশ্চিত হতো। কিন্তু দারিদ্র্য কৃত্রিম নয়—পকেটে টাকা থাকলেই চাল-ডাল-মুরগি কেনা যায়। অথচ পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ এখনো অনাহারে।
আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ—সুসময়ের জন্য নয়, দুঃসময়ের জন্য। সেই দুঃসময় আমাকে মানবিক করেছে। গতকাল সকালে এক ক্ষুধার্ত বালক আমার কাছে এসে নাস্তা খেয়েছে। তার ক্ষুধা এত তীব্র ছিল যে, থালার সবকিছু চেটেপুটে শেষ করল—হাত কাঁপছিল, চোখে অসহ্য আকুতি। আমি ভাবি: তার কাছে কি দারিদ্র্য মহত্ত্বের প্রতীক, নাকি শৈশব থেকে কেড়ে নেওয়া এক কঠোর বাস্তবতা? সেই মুহূর্ত আমাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে: ক্ষুধা কি মানুষকে মহান করে, নাকি শুধু ক্ষতবিক্ষত করে?
ক্ষুধা ব্যক্তিগত কষ্ট নয়—এটি সামাজিক ব্যর্থতার আয়না। যে সমাজে খাবার অপচয় চলে, সেখানে ক্ষুধার যন্ত্রণা সবার জন্য নৈতিক আঘাত। আমাদের দায়িত্ব শুধু নিজের পেট ভরানো নয়—অন্যের ক্ষুধার কথা ভাবা। নিজের থালার এক অংশ অন্যের জন্য রাখার সক্ষমতা অর্জন করলেই মানবিকতা পূর্ণ হয়।
নজরুলের কথার সাথে আমার মিল এখানে: দারিদ্র্য মানুষকে মহান করে না—মহান করে তার কর্ম। দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা সংযম শেখায়, দায়িত্ব বোঝায়। কিন্তু এই শিক্ষার জন্য কি ক্ষুধার যন্ত্রণা অপরিহার্য? আজকের অপচয়ের সমাজে এই সংবেদন তৈরি করাই সবচেয়ে জরুরি।
আল্লাহর দেওয়া খাবারের জন্য কৃতজ্ঞ হোন। অপচয় রোধ করুন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজের থালা ভাগ করে নেওয়ার সাহস অর্জন করুন। ক্ষুধার কষ্ট বড়, কিন্তু অন্যের ক্ষুধার প্রতি উদাসীনতা তার চেয়েও বড় কষ্ট।





