সাল ভিন্ন হলেও তারিখ টা ছিল এক। ১১ ফেব্রুয়ারি। যেদিন একই সাথে আমরা পেয়েছিলাম তিনজন উজ্জ্বল নক্ষত্রদের, হারিয়েছিলাম তিনজন প্রতিভাবান কবিদের। চলুন জেনে আসি কারা ছিলেন সেই ছয়জন সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
সুচিপত্র
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তঃ
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৮৮২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কলকাতার নিকটবর্তী নিমতা গ্রামে৷ তাঁর পৈতৃক নিবাস বর্ধমান এর চুপী গ্রামে৷
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় কবি ও ছড়াকার। রবীন্দ্র যুগের খ্যাতনামা “ছন্দরাজ” কবি। তাঁর কবিতায় ছন্দের কারুকাজ, শব্দ ও ভাষা যথোপযুক্ত ব্যবহারের কৃতিত্বের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘ছন্দের জাদুকর’ নামে আখ্যায়িত করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ, “সবিতা”, “সন্ধিক্ষণ”, “বেণু ও বীণা”, “হোমশিখা”, “ফুলের ফসল” ইত্যাদি।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত মূলত তাঁর কাব্যিক প্রতিভা, ছন্দের ব্যবহার এবং অনুবাদকর্মের জন্য সমাদৃত ছিলেন, কোনো বড় রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার তাঁর জীবদ্দশায় পাননি।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানঃ
১৯৪৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান ঝিনাইদহ জেলার লক্ষ্নীপুরের ফুরসুন্দিতে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি যশোর জেলার সদর উপজেলার খড়কীতে।
তিনি বাংলাদেশের একজন গীতিকবি ও লেখক। পাশাপাশি শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনী-চিত্রনাট্য-সংলাপ রচয়িতা। ইতোমধ্যে তার প্রকাশিত গানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। তার উল্লেখযোগ্য কিছু গান হলো “সেই রেললাইনের ধারে মেঠো পথটার পারে দাঁড়িয়ে”, “বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম”, “দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক”, “আমার মত এত সুখি নয় তো কারও জীবন” ইত্যাদি। প্রকাশিত গ্রন্থ, “হৃদয়ের ধ্বনিগুলো”।
সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য তিনি ২০২৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার ১৯৮৪, ১৯৮৬, ২০০৮, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার, ১৯৮২ ইত্যাদিতে ভূষিত হন।
আসাদ চৌধুরীঃ
আসাদ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়ার জমিদার চৌধুরী পরিবার নামে পরিচিত এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি মুসলিম পরিবারে।
তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশী কবি, লেখক, অনুবাদক, রেডিও, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী।
তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কবিতা গুলো হলো “তবক দেওয়া পান” , “বিত্ত নাই বেসাত নাই”, “জলের মধ্যে লেখাজো” ইত্যাদি। এছাড়াও তার ব্যঙ্গার্থক কবিতা ‘কোথায় পালালো সত্য’ একটি জনপ্রিয় পদ্য।
আসাদ চৌধুরী “বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮৭)” এবং “একুশে পদক(২০১৩)” পুরস্কারে ভূষিত হন।
সৈয়দ মুজতবা আলীঃ
সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি সাহিত্যিক, পরিব্রাজক, রম্যরচয়িতা ও বহুভাষাবিদ ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ভ্রমণকাহিনী “দেশে-বিদেশে”, রম্যরচনা “পঞ্চতন্ত্র”, ও ছোটগল্প “চাচা-কাহিনী” বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়াও পেশায় তিনি ছিলেন লেখক,সাংবাদিক,শিক্ষক,ভ্রামণিক,ভাষাবিদ।
তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী “দেশে-বিদেশে”
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে ।
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা এবং বার্ধক্যজনিত শারীরিক জটিলতা নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি সোমবার মাত্র ৬৯বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় (তৎকালীন পিজি হাসপাতালে, বর্তমানে বিএসএমএমইউ) মৃত্যুবরণ করেন।
রাম বসুঃ
রাম বসু ছিলেন একজন আধুনিক বাঙালি কবি এবং বহুকাল মার্কসবাদী চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক বছরের পর লেখা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ তোমাকে (১৯৫০) কবিতাপ্রেমী সমাজে সাড়া জাগায়।
রাম বসু নিজের নামে ১৪ টি কাব্যগ্রন্থ, দশটি কাব্য নাটক এবং “কনিষ্ক” ছদ্মনামে প্রবন্ধ ও উপন্যাস সহ আরো ষোলটি গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য কিছু কাব্যগ্রন্থ হলো, “দৃশ্যের দর্পণে”, “অন্তরালে প্রতিমা”, “হে অগ্নি, প্রবাহ”, “কানামাছি” ইত্যাদি।
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি একগুচ্ছ কাব্যনাট্য গ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি উল্টোরথ পুরস্কার পেয়েছেন।
কবি রাম বসু ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন।
মনিরউদ্দীন ইউসুফঃ
মনিরউদ্দীন ইউসুফ ছিলেন একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক,নাট্যকার, সম্পাদক ও অনুবাদক। তিনি কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, জীবনী, কিশোরসাহিত্য, অনুবাদ ও আত্মজীবনী মিলিয়ে ২৮টি গ্রন্থ রচনা করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু উপন্যাস হলো, “ঝড়ের রাতের শেষে”, “পনসের কাঁটা”, “ওর বয়েস যখন এগারো” ইত্যাদি। পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামা বাংলায় অনুবাদ করার জন্য তাকে ‘বাংলার ফেরদৌসী’ নামে অভিহিত করা হয়।
তিনি বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৯৩ সালে মরণোত্তর বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক-এ ভূষিত হন।
মনিরউদ্দীন ইউসুফ ১৯৮৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
আজ ১১ ফেব্রুয়ারি, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেইসব উজ্জ্বল নক্ষত্রদের, যাদের অবদানে আমরা সাহিত্য জগতে পেয়েছি শত শত কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র। যাদের উপস্থিতি ছিল বলেই সাহিত্য আজ এত সমৃৃদ্ধ।








মন্তব্য করুন