Share

ফাগুনের সব কেড়ে নিয়েছো | মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন

লিখেছেনঃমোহাম্মদ জাহিদ হোসেন

নিশি চা ঢালছিল। চিনি দিল না। অভিকের মতো। অভিক তো নেই। তিন বছর।

কলম হাতে নিল। কালি শুকিয়ে গেছে। অভিকের দেওয়া কলম—সেই কলম যা দিয়ে সে প্রথম চিঠি লিখেছিল। “তোমার চোখে বসন্ত লেগেছে।” নিশি রেগেছিল। এখন মনে হয়—কত ছোট বিষয় নিয়ে রাগ করা যায়। কত ছোট বিষয় মনে থেকে যায়।

কাগজে লিখল—”ফাগুনের সব কেড়ে নিয়েছো।” থামল। আর পারল না। কলম ফেলে দিল।

শেষবার কবে দেখেছিল?
তিন বছর আগে। না, তারও আগে। আষাঢ়। বৃষ্টি। অভিক ফিরেছিল রাতে। গন্ধ ছিল—হাসপাতালের। নিশি জিজ্ঞেস করেনি। জিজ্ঞেস করলে উত্তর পেতে হবে। উত্তর ভয়ঙ্কর হতে পারে।

পরদিন অভিক চলে গিয়েছিল। চিঠি রেখে—”তুমি ভালো থেকো। দোষ দিও না।” মাঝে ফাঁকা। নাকি কালি মুছে গেছে?
নিশি আলোতে ধরেছিল। দেখেছিল। কিছু নেই। শুধু ফাঁকা।
ফাঁকা মানে—সব?
নাকি কিছুই না?

তিন বছর ধরে ভেবেছে—অভিক চলে গেছে। অন্য কারো কাছে। সহজ ভাবনা। সহজে ঘৃণা করা যায়। ঘৃণা মানে—ভুলে যাওয়া। কিন্তু ভোলে নি।
ভোলেনি কেন?

দরজায় কড়া। নিশি খোলেনি। কে আসবে?
মা?
প্রতিবেশী?
কেউ নয়। কিন্তু কড়া নাড়ে। বারবার।

খুলল। দরজায় একজন মহিলা। চেনা না। না—চেনা। কোথায় দেখেছে?
মনে পড়ছে না।
“নিশি?”
“হ্যাঁ।”
“আমি অভিকের ডাক্তার ছিলাম।”

ডাক্তার। রোগ। কোন রোগ?
জিজ্ঞেস করল না। হাত কাঁপছে। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। টেবিলে রাখল।

“অভিক মারা গেছে।”

কাপ পড়ল না। হাত কাঁপল না। নিশি শুনল। শোনা মানে—বিশ্বাস?
না।
বিশ্বাস মানে—ব্যথা।
ব্যথা মানে—”কবে?”

“তিন বছর আগে। আষাঢ়ে।”

আষাঢ়। বৃষ্টি। সেই রাত। গন্ধ। হাসপাতাল। নিশি জানতো। জেনেও জানতো না।

জানা মানে—”লিউকেমিয়া। রক্ত ক্যান্সার। বলেনি। চেয়েছিল আপনি ভাবুন—সে চলে গেছে। সহজ বিদায়।”

নিশি বলল, “আপনি কেন এলেন?”

“চিঠি।”

মহিলা খাম বের করল। নিশির নাম। অভিকের হাতের লেখা। চেনে। কিন্তু এই খাম দেখেনি।

“আষাঢ়ের আগে লিখেছিল। জানতো মরবে।”

নিশি খুলল। সাত লাইন নয়। এক পৃষ্ঠা। প্রথম লাইন—”ফাগুনের সব কেড়ে নিয়েছি।” শেষ লাইন—”স্মৃতিটুকু তোমার কেন কাড়িনি, জানো?”

জানো। প্রশ্ন। উত্তর—

“কারণ স্মৃতি ছাড়া তুমি বাঁচতে পারবে না। আর আমি চেয়েছিলাম—তুমি বাঁচো।”

পেছনের পৃষ্ঠা। “পিকনিকের রাতে হাসপাতালে ছিলাম। রক্ত দিচ্ছিলাম। নিজের জন্য। বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু—”

লেখা শেষ। অসমাপ্ত।

মহিলা বলল, “সে চেয়েছিল আপনি ঘৃণা করুন। সহজে ভুলে যান। কিন্তু আপনি ভোলেননি।”

“কীভাবে জানেন?”

“জানি। অভিক জানতো। বলতো—নিশি ভুলবে না। ভুললে সে নিশি নয়।”

মহিলা চলে গেল। নিশি বসে আছে। চিঠি হাতে। পড়ছে। বারবার পড়ছে। “কিন্তু—” কী?
অভিক লেখেনি। লেখা হয়নি। হয়নি মানে—

নিশি উঠল। জানালার পাশে। বাইরে ফাগুন। কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে। কেউ তোলেনি।
সে তুলবে? না।
তোলা মানে—মারা। মরা মানে—
হাসল। কাঁদল না।

হাসি মানে—
বোঝা। বোঝা মানে—অভিক তাকে বাঁচতে দিয়েছে। স্মৃতি দিয়ে। ব্যথা দিয়ে। ব্যথা মানে—

নিশি ফোন তুলল। মায়ের নম্বর ডায়ল করল। রিং হচ্ছে। একবার। দুবার।
“হ্যাঁ?”
“আমি ভালো নেই।”
মা চুপ থাকল। নিশি চুপ থাকল। চুপ মানে—
“আসো,” মা বলল।
নিশি রাখল। চিঠি বুকে নিল। বেরিয়ে গেল।
ফাগুনের হাওয়া লাগল। গন্ধ—কৃষ্ণচূড়ার নয়।
অন্য কিছুর। অভিকের নয়। নিজের।
নিজের মানে—বাঁচা।