১৩ই ফেব্রুয়ারি, দিনটি সাধারণ কোনো দিন নয়। আজকের এই দিনটি উপহার দিয়েছিল সাহিত্যের দুটি নক্ষত্র। একজন মনিরউদ্দীন ইউসুফ আর আরেকজন গাজীউল হক। মুক্তোর মালায় যেমন নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর একটি করে বিশেষ ধরনের মুক্তো গাঁথা থাকে, ঠিক তেমনি এই দুজন নক্ষত্রও সময়ের একই সুতোয় গাঁথা, আর এর দূরত্ব হলো এক দশক।
সুচিপত্র
মনিরউদ্দীন ইউসুফ:
প্রতিভাধর এই কৃতী সাহিত্য ব্যক্তিত্ব ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর ময়মনসিংহের সবুজ ঐশ্বর্যে ঘেরা নদী নিসর্গ প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যপূর্ণ কিশোরগঞ্জ জেলাধীন তাড়াইল উপজেলার জাওয়ার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কবি, গজল রচয়িতা, গবেষক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, নাট্যকার এবং সর্বোপরি প্রাজ্ঞ অনুবাদক। তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হলো ‘উপায়ন’, যা তাঁর বাইশ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়। তাঁর সবচেয়ে বড়, অসাধারণ ও অতুলনীয় কীর্তির মধ্যে পারস্যের কবি আবুল কাসিম ফিরদাউসীর বিখ্যাত ‘শাহনামা’র পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ অন্যতম, যা তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর পরিশ্রম করে করেন। তাঁর উপন্যাস ‘ঝড়ের রাতের শেষে’ (১৯৬২), ‘পনসের কাঁটা’ (১৯৮১) ও ‘ওর বয়স যখন এগারো’ (১৯৮৫)—এই উপন্যাসগুলোতেও তিনি মানুষের আদর্শ, চিন্তা-চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। তাঁর বেশ কটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ্য ‘নব পরিচয়ে রবীন্দ্রনাথ’, ‘আত্মপরিচয় ঐতিহ্যের আলোকে’, ‘বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব’। সবশেষে ১৯৮৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রটি নিভে যায়।
গাজীউল হক:
গাজীউল হক ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গাজীউল হক একজন সাহিত্যিক, গীতিকার এবং ভাষাসৈনিক, যিনি ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি গাজীউল হক নামেই সমধিক পরিচিত। তবে তাঁর পুরো নাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের অন্যতম ছিলেন গাজীউল হক। গাজীউল হকের ‘ভুলব না ভুলব না ভুলব না এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি গেয়ে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরি করা হতো। তিনি রাষ্ট্রভাষা পদক ও সম্মাননা স্মারক, শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো— ‘জেলের কবিতা’, ‘এখানে ও সেখানে’, ‘একটি কাহিনী’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘এগিয়ে চলো’, ‘মোহাম্মদ সুলতান’, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন’ ইত্যাদি। সবশেষে তিনি ২০০৯ সালের ১৭ জুন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান পরপারে। আর বাংলা সাহিত্য থেকে ঝরে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এ কারণেই হয়তো জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন— “নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়”।








মন্তব্য করুন