
রাত প্রায় তিনটা। মোহাম্মদপুরের ছোট ফ্ল্যাটটায় সিলিং ফ্যান ধীরে ঘুরছে, মাঝে মাঝে থেমে যাওয়ার ভঙ্গি করে আবার চলতে শুরু করে। আরিফের টেবিলে বই, খাতা আর ল্যাপটপ—সব একসাথে পড়ে আছে। ল্যাপটপের নীল আলো তার চোখের কোণে পড়ছে। স্ক্রিনে দুটি উইন্ডো। একটায় ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির ফর্ম, আরেকটায় মোহাম্মদপুরের ওই স্টার্টআপের চাকরির অফার লেটার। মাউসের কার্সর দুই পাশে দুলছে। আরিফ জানে না। জানে না কোন পথে হাঁটলে মাটি শক্ত থাকবে।
এই দ্বিধা কেবল তার নয়। আজকের তরুণদের বড় অংশ এই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমাদের বাবা-মায়ের সময় পথ ছিল সরল—স্কুল, কলেজ, চাকরি, সংসার। কিন্তু এখন? এখন প্রতিটি মোড়ে পাঁচটি রাস্তা, আর প্রতিটি রাস্তায় হাজারো “যদি”। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন “সিদ্ধান্ত ক্লান্তি”। আমি বলি, হাজারো স্বপ্নের ভারে নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
সকালে উঠেই ফোন হাতে নেয় আরিফ। ফেসবুকে বন্ধুদের ছবি—লন্ডনের ব্রিজ, নিউইয়র্কের রাস্তা, কারো নতুন চাকরির পোস্ট। সবাই দৌড়াচ্ছে। কেবল সে পিছিয়ে। বিকেলে খালার ফোন, “ছেলেটা এখনো ঠিক হলো না? কবে চলে যাবে?” সন্ধ্যায় বাবার চুপচাপ মুখ, মায়ের অবোল হতাশা। কেউ জিজ্ঞেস করে না, সে কি চায়। সে কি সত্যিই বিদেশ যেতে চায়? নাকি শুধু সমাজের চোখে “সফল” বলে গণ্য হতে চায়? নাকি তার আসলে লেখালেখি করার ইচ্ছা, যেটা সে বারবার চেপে রাখে?
এই তুলনা, এই প্রত্যাশা—একসাথে মিলে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি করে। মনে হয়, আমি অন্যের সিনেমার দর্শক, যে নিজের চরিত্র ছাড়াই অন্যের সাফল্য দেখছি। আরিফ ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনলাইন কোর্স, ফ্রিল্যান্সিং গাইড, বিদেশে পড়াশোনার টিপস—সব দেখে, কিছুই শুরু করতে পারে না। মনে হয়, পিছিয়ে যাচ্ছি। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আমি আটকা।
একদিন ফোন করেছিল আরিফ। চোখের নিচে কালো দাগ, গলায় হতাশার ছাপ। “আমি কিছুই ঠিক করতে পারছি না। মাথায় হাজারটা চিন্তা, কোনোটাই শেষ হয় না।” আমি বললাম, “তুমি পিছিয়ে পড়োনি। তুমি শুধু বহু পথের মাঝে দাঁড়িয়ে আছ। জীবন কোনো বহুনির্বাচনী পরীক্ষা নয়, যেখানে একটি মাত্র সঠিক উত্তর। জীবন একটা রচনা। তুমি নিজের যুক্তি দিয়ে লিখে যাও। সঠিক বা ভুল—মনে করো না। লেখাটা তোমার হলেই হলো।”
কয়েকদিন পর আরিফ সিদ্ধান্ত নিল। ইউরোপের বৃত্তি বাতিল করে দিল। কেন? সে বুঝতে পারল, সে বিদেশ যেতে চায়নি; সমাজের চোখে সফল হতে চেয়েছিল। মোহাম্মদপুরের ওই ছোট স্টার্টআপে যোগ দিল। বেতন কম, ঝুঁকি বেশি, কাল কী হবে কেউ জানে না। কিন্তু গতকাল ফোনে বলছিল, “প্রথম সপ্তাহেই ঘুমানোর সময় মনে হলো, অন্তত নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। অন্যের স্বপ্ন নয়, নিজের স্বপ্নের পেছনে হাঁটছি।”
বিকল্পের এই যুগে সাহসী হওয়া মানে সবকিছু নেওয়া নয়। মানে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা। মানে নিজের অগোছালো জীবনকে মেনে নেওয়া, অন্যের ঝকঝকে সাফল্যের গল্প থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া। প্রতিদিন এক-দুটি পছন্দের দিকে মনোযোগ দেওয়া। অপ্রয়োজনীয় তথ্য এড়িয়ে চলা। সামাজিক মাধ্যম থেকে নিজেকে কিছুক্ষণ সরিয়ে নিয়ে, নিজের ভেতরটার দিকে তাকানো।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের জন্য এটি কঠিন। পরিবারের প্রত্যাশা, বন্ধুর তুলনা, অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে নিজের ইচ্ছাটা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা যা নিয়ে বাঁচব, তা হলো নিজের নির্বাচিত জীবন। আর যা নিয়ে মরব, তা হলো অন্যের জন্য নিজেকে ছিঁড়ে খাওয়া।
জীবন কারো কাছে দেখানোর মঞ্চ নয়। জীবন হলো নিজের সাথে নিজের সেই নীরব সম্পর্ক, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নিজস্ব, প্রতিটি ভুলও নিজের। সেই সত্যটুকু যখন বুকের ভেতর ধরা দেয়, তখন বিকল্পের ভার হালকা হয়ে যায়। তখন বাম বা ডান—কোনো পথই ভয়ের নয়। শুধু একটিই উদ্দেশ্য থাকে—এগিয়ে যাওয়া। নিজের পথ নিজে তৈরি করার সাহসই হলো আসল সাফল্য।






