
রাত সাড়ে দশটা। বাইরে বৃষ্টি—টিনে টুপটাপ, করিডোরে কাঁচা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। জরুরি বিভাগের দেয়ালে পলেস্তারা উঠে গেছে; এক কোণায় কালি দিয়ে কেউ লিখে গেছে, “২০১৯—এখনও বেঁচে আছি।”
পাশের বেঞ্চে এক বৃদ্ধ কাশছিলেন। মনে হচ্ছিল কাশি নয়—ভেতর থেকে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে।
আমার সামনে মাঝবয়সী এক লোক। অফিস যাওয়া শার্ট, কলারে ভাঁজ। হাতে প্রেসক্রিপশন। ডাক্তারের লেখা পড়া যায় না, কিন্তু টাকার অঙ্কটা স্পষ্ট—তিন হাজার… না, তারও বেশি।
তিনি পকেটে হাত ঢোকান। বের করেন। আবার ঢোকান। একই তিনটা নোট। আঙুলে নোটের কোণা মোচড়াচ্ছে।
আমি তাকিয়ে ছিলাম। কিছু বলিনি। পারিনি।
আমার বাবাকে দেখেছি এমন। জ্বর নিয়ে ফ্যাক্টরিতে যেতেন। বলতেন, “ছুটি নিলে কাটছাপ।” আমরা জানতাম না। মা জানতেন না। পরে যখন ফুসফুসে সমস্যা ধরা পড়ে, ডাক্তার বলেছিলেন—আগে এলে হতো।
আগে আসেননি। কারণ আসা মানে স্বীকার করা।
স্বীকার করা মানে ভরসা ভাঙা।
আমার বন্ধু সোহেল—বুকে ব্যথা হচ্ছিল। স্ত্রীকে বলেছে, “গ্যাস।” রিপোর্টে অ্যাঞ্জাইনা ধরা পড়েছে। এখনও পুরো সত্যি বলেনি।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কেন?”
সে বলেছিল, “ওরা ভয় পাবে।”
আমি ভাবি—কার ভয়? তাদের, না নিজের?
অসুস্থতা নিজেই যুদ্ধ। দারিদ্র্য সেটাকে দ্বিগুণ কঠিন করে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখরচের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়—অনেক ক্ষেত্রে ৬০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে অসুস্থ হওয়া মানে শুধু রোগ না, ঋণও।
রিকশাচালক আবুল খায়েরকে চিনি। একদিন দেখি পা টেনে চালাচ্ছে। বলে, “বয়স হইছে।” পরে জানলাম হাড়ে ফাটল। চালায়, কারণ বউ অসুস্থ, ছেলের ওষুধ লাগে।
গার্মেন্টসে কাজ করা এক আত্মীয় জ্বর নিয়ে মেশিন চালায়। ছুটি মানে বেতন কাটা। বেতন কাটা মানে স্কুল ফি বন্ধ।
এই মানুষগুলো একা নয়। পরিবার আছে। কিন্তু তারা বলতে পারে না। কারণ বলা মানে অক্ষমতা স্বীকার করা—আর অক্ষমতা যেন পুরুষ পরিচয়ের বাইরে কিছু।
“ছেলেরা কাঁদে না”: বিপজ্জনক শিক্ষা
ছোটবেলা থেকে শুনেছি—“ছেলেরা কাঁদে না।”
এই কথাটা শুধু বাক্য না, মানসিক কাঠামো।
ফলে একজন পুরুষ শিখে—কষ্ট লুকাতে,
ভয় চেপে রাখতে, সাহায্য না চাইতে।
অসুস্থ হলে সে হাসপাতালে বসেও হিসাব করে—বাসা ভাড়া, সন্তানের ফি, বাবার ওষুধ। সে কাঁদে না। ভাবছে, কাঁদলে সব থেমে যাবে।
অথচ না কাঁদলেও কিছু থেমে যায়—নিজের ভেতরে।
পরিবার কি সত্যিই পাশে থাকে না?
আমরা বলি—পুরুষ একা লড়াই করে।
কিন্তু সে কি কাউকে জানায়?
অনেক পুরুষ রিপোর্ট লুকায়। ব্যথা লুকায়। জ্বর লুকায়। কারণ তারা ভয় পায়—পরিবার চিন্তায় পড়বে, নিজের সম্মান কমবে।
এই নীরব অহংকার কখনো মহৎ, কিন্তু প্রায়ই বিপজ্জনক।
মানুষ একা বাঁচার জন্য তৈরি হয়নি। সমাধান আবেগে নয়, কাঠামোয়।
এই সমস্যার সমাধান শুধু সহানুভূতি দিয়ে হবে না। বাস্তব কৌশল দরকার।
প্রতি মাসে অল্প সঞ্চয়। ১০০ টাকা হলেও।
সীমিত হলেও স্বাস্থ্যবীমা আছে—জানতে হবে, ভাবতে হবে।
একজন বন্ধু, একজন সহকর্মী—যার কাছে বলা যায়, “আমার ভয় লাগছে।”
“আমি ঠিক আছি”—এই বাক্যটা অনেক সময় মিথ্যা। পরিবারকে শুনতে শিখতে হবে।
সেই রাতে হাসপাতালের মাঝবয়সী লোকটা উঠে দাঁড়ালেন। আমি দেখলাম তিনি ফার্মেসির দিকে গেলেন না। সোজা বেরিয়ে গেলেন।
হয়তো কাল আসবেন। হয়তো আসবেন না।
আমি তার নাম জানি না। কিন্তু তাকে চিনি। আমার বাবাকে চিনি। আবুল খায়েরকে চিনি। নিজেকেও চিনি।
পুরুষের যুদ্ধ একা নয়। আমরা তাকে একা হতে শিখিয়েছি।
এখন শেখাতে হবে—বলতে। শুনতে।
কাঁদতে।পুরুষের যুদ্ধটা একার
কারণ কাঁদা মানে ভাঙা নয়। মানুষ হওয়া।






