
আমি যখন প্রথম ‘পথের পাঁচালী’ পড়ি, অপুর মাকে চাল মুঠো করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবি—এই ক্ষুধা কি শুধুই পেটের জন্য? নাকি মর্যাদা হারানোর, সন্তানের সামনে অসহায় হওয়ার? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, দারিদ্র্যে মানুষ কেবল ক্ষুধার্ত হয় না, অদৃশ্যও হয়ে যায়। অপুর ছোট ভাই যখন বলে, “দিদি, আমার পেট খুব খারাপ করছে,” তখন শোনা যায় ক্ষুধার কথা, কিন্তু দেখা যায় মায়ের নীরব সংগ্রাম—কীভাবে নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানকে বাঁচানো যায়।
বাংলা সাহিত্যে ক্ষুধা বারবার ফিরে আসে, কিন্তু প্রতিটি লেখক এটিকে ভিন্ন চোখে ধরেন। এই ভিন্নতাই আমাদের সমাজের ক্ষুধার বহুমাত্রিক চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ ক্ষুধা খাদ্যের নয়—স্বীকৃতি, ভালোবাসা, আত্মার পূর্ণতার অভাবের। দেবদাসের চোখে ক্ষুধা হলো লজ্জা, অসমর্থতা, আত্মার অভাব। মানিকের অপু শারীরিক ক্ষুধা নিয়ে বড় হয়; দেবদাস আত্মিক ক্ষুধার সঙ্গে ভেঙে পড়ে। দুটি ক্ষুধা, দুটি ভাগ্য—একটি জীবন দেয়, অন্যটি নিংড়ে নেয়।
সেলিনা হোসেনের নারীরা ক্ষুধার্ত স্বাধীনতা ও স্বীকৃতির জন্য লড়েন। ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’-এর মতো রচনায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী নারীর ক্ষুধা নীরব নয়—বিদ্রোহী। তারা খাদ্য চায় না শুধু; চায় সমাজের পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের বিরুদ্ধে নিজের স্থান। এখানে ক্ষুধা ব্যক্তিগত থেকে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে—এক নারীর অভাব সমাজের অসমতার প্রশ্ন তোলে।
হুমায়ূন আহমেদের শহুরে যুবকরা ক্ষুধার্ত অর্থের জন্য নয়, বরং জীবনের অর্থের জন্য। ‘নন্দিত নরকে’ বা ‘ফেরা’-র মতো গল্পে দেখা যায় মধ্যবিত্তের অসারতা—স্যালারি দিয়ে পেট ভরে, কিন্তু স্বপ্নের অর্থহীনতা মেটে না। এ ক্ষুধা গ্রামের দারিদ্র্য নয়, শহরের শূন্যতা।
এই চারটি স্তর—মানিকের শারীরিক, শরৎচন্দ্রের আত্মিক, সেলিনার রাজনৈতিক, হুমায়ূনের অস্তিত্বগত—মিলে ক্ষুধার পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। ক্ষুধা শুধু অভাব নয়; এটি সমাজের আয়না। জমিদারি, পুরুষতন্ত্র, পুঁজিবাদ—এগুলো ক্ষুধার মূল কারণ। সাহিত্য যখন কারণ দেখায়, তখনই তা বিদ্রোহে রূপান্তরিত হয়।
আমি নিজেও ক্ষুধার অভিজ্ঞ। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এমন দিন আমারও ছিল। তাই অপুর মাকে দেখে বুঝি—দৃশ্যটি শুধু সাহিত্য নয়, স্মৃতি। কিন্তু আমার ক্ষুধা আর অপুর ক্ষুধার পার্থক্য স্পষ্ট: আমি লিখতে পারি, অপু শুধু সহ্য করে। সাহিত্য কি ক্ষুধাকে সহনশীল করে? নাকি বিদ্রোহের ভাষা দেয়?
বাংলা সাহিত্যে ক্ষুধা দুই রূপে প্রকাশিত হয়: সহনশীল (অপুর মা যেমন লুকিয়ে সহ্য করেন) এবং বিদ্রোহী (সেলিনার নারীরা যেমন প্রশ্ন তোলেন)। দুটিই সত্য। কিন্তু যখন আমরা শুধুই সহনশীলতা দেখি, বিদ্রোহকে ভুলে যাই, তখন সাহিত্য সমাজের সমালোচক নয়, কেবল সেবক হয়ে যায়।
নজরুল বলেছিলেন, “হে দারিদ্র তুমি মোরে করিয়াছ মহান।” আমি একমত নই। ক্ষুধা মহান করে না—ক্ষতবিক্ষত করে। মহান করে ক্ষুধার প্রতিবাদ। অপুর মা মহান কারণ তিনি সহ্য করেছেন, কিন্তু সেলিনার নারীরা মহান কারণ তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
আজকের বাংলাদেশে ক্ষুধা দুই রূপে দেখা যায়: গ্রামের (মানিকের মতো) এবং শহরের (হুমায়ূনের মতো)। সাহিত্য কি এখনো এই ক্ষুধাকে ধরতে পারে, নাকি ক্ষুধা এখন শুধু Instagram-এর ফিল্টার হয়ে গেছে?
সাহিত্যের দায়িত্ব ক্ষুধা দেখানো নয়—কারণ দেখানো। অপু ক্ষুধার্ত কারণ জমিদারি আছে; দেবদাস ক্ষুধার্ত কারণ সমাজ নিয়ম তৈরি করে; সেলিনার নারী ক্ষুধার্ত কারণ পুরুষতন্ত্র আছে। যখন সাহিত্য কারণ দেখায়, তখনই তা বিদ্রোহ হয়ে ওঠে।
গতকাল এক বালক আমার কাছে খেতে এসেছিল। থালা চেটেপুটে খেয়ে গেল। আমি ভাবি—এই ক্ষুধা কি সাহিত্যে আসবে? নাকি সাহিত্য এখন শুধু শব্দের খেলা?
বাংলা সাহিত্যের শিক্ষা স্পষ্ট: ক্ষুধাকে সহ্য করতে হয়, কিন্তু প্রশ্নও করতে হয়। সহনশীলতা বাঁচায়, কিন্তু বিদ্রোহ ছাড়া মুক্তি আসে না। দুটির মধ্যে টানাপোড়েনে থাকাই মানবতা, এবং এভাবেই সাহিত্য সমাজের প্রকৃত বিদ্রোহের সাক্ষী হয়ে ওঠে।





