Share

অপারেশনের পরের নীরবতা | মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন

Avatar photo
লিখেছেনঃguestauthor

হাসপাতালের করিডোরে সময়ের শব্দ শোনা যায়। দেয়ালের ঘড়ি থেমে আছে। দূরে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ঠোকাঠুকি।

অভিক বসে আছে। তার ডান পাশের চেয়ারটা ফাঁকা। ধাতব, রঙ ওঠা। সে মাঝে মাঝে হাত রাখে সেখানে।

ডাক্তাররা বলেছিলেন, অপারেশন সফল। রিপোর্টে লেখা—স্থিতিশীল। কিন্তু রাতের বেলা বুকের ভেতর চাপ জমে। পাথরের মতো ব্যথা। শ্বাস নিতে কষ্ট।

এক রাতে নিজেই রিকশা ডেকে হাসপাতালে এলো। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, “কেউ নেই?” অভিক হেসে বলল, “আসবে।” কেউ আসেনি।

এক সময় বাড়ি শব্দে ভরা ছিল। ছোট দুই ভাইয়ের বই উল্টানোর আওয়াজ, মায়ের কাশি, বাবার রেডিও। অফিস থেকে ক্লান্ত ফিরে এসেও মনে হতো চারপাশে মানুষ। এখন বাড়ি বড়, ফাঁকা। দেয়াল শুধু আলো ফিরিয়ে দেয়।

বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, “সবাইকে দিতে গিয়ে নিজেকে খালি কোরো না।” তখন উপদেশ মনে হয়েছিল। এখন বোঝা যায়—অভিজ্ঞতা।

আজ বন্ধুর চেম্বারে বসে। পাশে এক ছেলে বাবার কাঁধে মাথা রেখেছে। এক মহিলা স্বামীর প্রেসক্রিপশন ভাঁজ করছে। অভিক চোখ নামিয়ে রাখে। অন্যের পাশে কেউ থাকলে তাকানো কঠিন।

ডাক্তার ডাকল। ভেতরে গেল। 
ডাক্তার চশমা ঠেলে বললেন, “আজকের রিপোর্ট ভালো। কিন্তু মনের চাপ কমাতে হবে। একা থাকলে ব্যথা বাড়ে। কেউ আসেনি আজ?” 
অভিক চুপ। তারপর বলল, “আসার কথা ছিল।” 
ডাক্তার একটু থেমে বললেন, “কথা না বললে বুক ভারী হয়ে থাকে। ফোন করুন কাউকে।” 
অভিক মাথা নাড়ল। বেরিয়ে এল।

চেয়ারটা রয়ে গেল। আলো এসে পড়ল সেখানে। মুহূর্তের জন্য মনে হল—কেউ বসে আছে। পরক্ষণে আলো সরে গেল।

বাড়ি ফিরে ঘড়ির ব্যাটারি বদলাল। ঘড়ি আবার চলল। টিক… টিক… বুকের ভেতরেও শব্দ। প্রথমবার মনে হল—শব্দটা শুধু ব্যথা নয়।

মোবাইল হাতে নিল। নামগুলো স্ক্রিনে জ্বলে উঠল। একটা নামের ওপর আঙুল থামল। ফোন বাজল। বেজে উঠল। কয়েকবার। অভিক তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কানে লাগাল না। ফোনটা নিভে গেল।

এক রাতে জানালার পাশে বসে আকাশ দেখল। তারা নেই। শহরের শব্দ ভেসে আসে। হাসপাতালের বেডে একাকীত্ব, বাড়িতে একাকীত্ব—সবাই একা।

চেয়ারটা মনে হল বলছে—“আমি এখানে ছিলাম, কিন্তু কেউ দেখেনি।”

অভিক হাত রাখল। আর ঠান্ডা লাগল না। প্রথমবার মনে হল—মানুষের জন্য অপেক্ষা করা যায়, নিজের জন্যও।

বুকের ব্যথা থেকে গেল। কিন্তু সে বুঝল—হৃদয়ে রিং বসানো যায়, সম্পর্কের ফাঁক নিজেকে রাখতে হয়। অপারেশন সারলেই সব ঠিক হয় না। শব্দ, স্পর্শ, দেখাশোনা—এগুলোই শেষ পর্যন্ত থাকে।

সন্ধ্যার আলো জানালা দিয়ে ভেসে এল। চেয়ারের ধাতব উজ্জ্বল। ফাঁকা জায়গাটা অদ্ভুত শান্ত।

অভিক চুপচাপ বসে রইল। শহরের শব্দ, হাসপাতালের নিঃশব্দ, ঘরের শান্তি—সব মিলে গেল।

ব্যথা কমেনি। কিন্তু সে অনুভব করল—একটা স্থান আছে, যেখানে একা থাকা যায়, কিন্তু কেউ না থাকলেও আশ্রয় পাওয়া যায়।

সন্ধ্যা শেষে ঘুমাতে গেল। চেয়ার ফাঁকা রইল। বুকের নীরবতা রইল। মোবাইল স্ক্রিন নিভে গেল। তবু মনে হল—কেউ তার গল্প পড়েছে, যেন সে সবসময় বসে আছে।