সালটা ২০০০। তখন ঢাকায় এখনকার মতো এত মানুষ বা গাড়ির জ্যাম ছিল না। মোবাইল ফোন হাতেগোনা কয়েকজনের কাছে, আর সন্ধ্যা নামলেই শহরের অনেক এলাকা ঝিমিয়ে পড়ত।
ঘটনাটা নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের। টিউশন শেষ করে আমি আর আমার বন্ধু রাহাত মৎস্য ভবন থেকে হেঁটে শাহবাগের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন রমনা পার্কের দেয়ালগুলো বেশ নিচু ছিল, আর গেটগুলোতে কড়া নিরাপত্তা থাকত না। শর্টকাট মারার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটে অপর পাশে বের হব।
রাত তখন সোয়া ৮টা। শীতের হালকা আমেজ শুরু হয়েছে। পার্কে ঢোকার পর দেখলাম চারপাশ অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। মাঝে মাঝে দু-একটা সোডিয়াম লাইট জ্বলছে, বাকিটা গা ছমছমে অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। লেকের পাড় ধরে আমরা হাঁটছিলাম।
হঠাৎ রাহাত থমকে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল, “দোস্ত, ওই বেঞ্চটার দিকে তাকা।”
আমি তাকালাম। লেকের ধারের একটি পুরোনো সিমেন্টের বেঞ্চে একজন বসে আছে। আবছা অন্ধকারে বোঝা গেল, ওটা একটা মেয়ে। পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, পিঠভর্তি খোলা চুল। সে লেকের পানির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
আমি বললাম, “ধুর, হয়তো কোনো কাপল ঝগড়া করেছে। চল আমরা আমাদের মতো যাই।”
কিন্তু রাহাতের পা নড়ছিল না। ও বলল, “ভালো করে দেখ। ওর পা নেই।”
আমি ধমক দিয়ে তাকালাম, কিন্তু তাকাতেই আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। মেয়েটার সালোয়ারের নিচ থেকে সত্যিই কোনো পা মাটির সাথে ঠেকেনি, মনে হচ্ছে সে শূন্যে ভেসে বসে আছে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, আমাদের উপস্থিতি টের পাওয়ার কথা থাকলেও সে নড়ছে না, কিন্তু তার শরীর থেকে একটা পচা ফুলের উগ্র গন্ধ ভেসে আসছে।
রাহাত আমার হাত খামচে ধরল, “দৌড় দে!”
আমরা পেছনের গেটের দিকে দৌড়াতে চাইলাম, কিন্তু মনে হলো পা দুটো পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। ঠিক তখনই মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাতে শুরু করল। হাড় মটমট করার একটা বিকট শব্দ হলো, যেন কোনো শুকনো কাঠ ভাঙা হচ্ছে। তার মুখটা যখন আমাদের দিকে ফিরল সেখানে কোনো চোখ, নাক বা মুখ ছিল না। পুরো মুখটা চামড়া দিয়ে ঢাকা, শুধু কপালের মাঝখানে একটা দগদগে কাটা দাগ।
সেই ‘মুখ’ থেকে একটা অমানবিক গোঙানির শব্দ বের হলো, যা কোনো মানুষের গলা থেকে বের হওয়া অসম্ভব। বাতাসের বেগ বেড়ে গেল, আর পার্কের গাছগুলো পাগলের মতো দুলতে শুরু করল। মনে হলো লেকের পানি থেকে কেউ বা কারা উঠে আসছে।
আমরা আর পেছনে তাকাইনি। জানপ্রাণ নিয়ে ছুটলাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের গেটের দিকে। দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হচ্ছিল কানের খুব কাছে কেউ ফিসফিস করে বলছে, “আজকে থেকে যাবি না… থেকে যা…”
কোনোরকমে মেইন রোডে এসে যখন রিকশার চাকার শব্দ আর মানুষের কোলাহল পেলাম, তখন দুজনেই রাস্তায় বসে পড়লাম। ঘামে শরীর ভিজে একাকার।
সেই রাতে রাহাত প্রচণ্ড জ্বরে পড়ল। টানা তিন দিন সে প্রলাপ বকেছিল শুধু বলত, “ওটা আসছে… জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।”
২০০০ সালের পর আমরা আর কোনোদিন সন্ধ্যার পর রমনা পার্কের ওই রাস্তা দিয়ে যাইনি। আজও ওই লেকের ধারের বেঞ্চটার কথা মনে পড়লে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়।








মন্তব্য করুন